মোঃ আনোয়ার ইসলাম নাটোর প্রতিনিধি
কষ্টের কৃষ্ণপক্ষ পেরিয়ে অবশেষে জোনাইলবাসীর যাতায়াতে উঁকি দিচ্ছে এক বুক সুখের সূর্য। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা ও ঐতিহ্যবাহী বড়াল নদীর ওপর জোনাইল বাজারের সেই বহু কাঙ্ক্ষিত নতুন সেতুর নির্মাণকাজ এখন পুরোদমে দৃশ্যমান। বছরের পর বছর ধরে চলা অবর্ণনীয় নরকযাতনা আর মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে পথচলার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে শুরু হয়েছে এক আধুনিক ও টেকসই সেতুর কর্মযজ্ঞ। ভাঙা ও জরাজীর্ণ সেতুর বুক চিরে নতুন সেতুর এই আগমনী বার্তা জোনাইল ও পাগলা বাজার এলাকার হাজার হাজার মানুষের মনে আনন্দ আর স্বস্তির জোয়ার এনে দিয়েছে। তবে আনন্দের এই মাহেন্দ্রক্ষণেও এলাকাবাসীর একটাই জোরালো দাবি—‘কাজের মান যেন হয় শতভাগ টেকসই ও নিখুঁত’।জরাজীর্ণ সেতু ও বড়াল নদীর বেহাল দশা: দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কষ্টঅনুসন্ধানে জানা যায়, জোনাইল ও পাগলা বাজার এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ী এবং পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারের প্রবেশমুখে থাকা সেতুটি বিগত দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও অকেজো অবস্থায় পড়ে ছিল। পিচ-পাথর উঠে গিয়ে রড বেরিয়ে পড়া ওই নড়বড়ে সেতুটি রূপ নিয়েছিল পথচারীদের মরণফাঁদে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই সেতু দিয়ে পার হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটেছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। একটু অসাবধান হলেই খালের পানির স্রোতে কিংবা নদীতে পড়ে যাওয়ার ভয়ে তটস্থ থাকতে হতো বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের।শুধু বন্ধ থাকা ব্যবসাই নয়, এলাকার মানুষের কষ্টের আরেক বড় কারণ ঐতিহ্যবাহী বড়াল নদী। একসময় যে নদীতে বছরজুড়ে পানির তীব্র স্রোত আর বড় বড় মালবাহী নৌকা চলত, আজ প্রশাসনের অবহেলা আর অবৈধ দখলের কারণে সেই বড়াল নদীও তার নাব্য হারিয়ে বেহাল দশায় পতিত হয়েছে। নদীর বুক শুকিয়ে যাওয়া আর সেতুর বেহাল দশা—এই দুই মিলে জোনাইলবাসীর কষ্টকে করে তুলেছিল দ্বিগুণ। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ একদিকে নতুন সেতু এবং অন্যদিকে এই বিশাল বড়াল নদীটি পুনর্খনন ও সংস্কারের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিলেন।কষ্টের পর সুখের আশা: দৃশ্যপটে স্বপ্নের নতুন সেতুঅবশেষে জোনাইলবাসীর সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বঞ্চনা আর কান্নার দিন শেষ হতে চলেছে। জোনাইল বাজারের ওপর নতুন এই সেতুর নির্মাণকাজ পরিপূর্ণভাবে শুরু হওয়ায় এলাকায় যেন প্রাণ ফিরে এসেছে। নদীর বুকে পাইলিং ও অবকাঠামোগত কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের চোখে-মুখে এখন বিজয়ের আনন্দ। পথচারী ও হাটুরেরা এখন সেতু পার হওয়ার সময় থমকে দাঁড়াচ্ছেন, পরম তৃপ্তি নিয়ে দেখছেন তাদের বহু বছরের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন। দীর্ঘদিনের দুঃখ ঘুচে গিয়ে পুরো উপজেলায় এখন বইছে উন্নয়নের সুবাতাস।এলাকাবাসীর বজ্রকণ্ঠ: "কষ্টের সুখ যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়, কাজের মান চাই আন্তর্জাতিক"সেতু নির্মাণ শুরু হওয়ায় জোনাইলবাসী যেমন আনন্দিত, ঠিক তেমনি অতীতে কাজের ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম দেখে তাদের মনে রয়েছে এক গভীর উৎকণ্ঠা। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ভ্যানচালক, কৃষক ও সাধারণ পথচারীদের মুখে এখন একটাই জোরালো দাবি—"আমরা অনেক কষ্ট করেছি, আর কোনো জোড়াতালির কাজ দেখতে চাই না। এই সেতুর নির্মাণসামগ্রী ও কাজের মান যেন হয় শতভাগ মানসম্মত ও টেকসই।"জোনাইল বাজারের কয়েকজন প্রবীণ ব্যবসায়ী ক্ষোভ ও আকুতি মেশানো কণ্ঠে বলেন, "আমরা বছরের পর বছর ভাঙা সেতুতে জীবন বাজি রেখে ব্যবসা করেছি। এখন সরকার নতুন সেতু দিচ্ছে, আমরা আনন্দিত। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের কাছে আমাদের হাতজোড় অনুরোধ—কাজের মানে যেন বিন্দুমাত্র ফাঁকি দেওয়া না হয়। আমরা এমন এক সেতু চাই যা যুগের পর যুগ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সেবা দেবে।" একই সাথে তারা ঐতিহ্যবাহী বড়াল নদীটিকেও পুরোপুরি উদ্ধার করে অবমুক্ত করার দাবি জানান।গতি ফিরবে গ্রামীণ অর্থনীতিতেস্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জোনাইল বাজারের এই সেতুটি কেবল একটি কংক্রিটের কাঠামো নয়, এটি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির মহাসড়ক। সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে পাগলা বাজার ও জোনাইল বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটবে। কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য কোনো ভোগান্তি ছাড়াই সরাসরি দেশের বড় বড় আড়তে নিয়ে যেতে পারবেন। দুর্ভোগের অন্ধকার পেরিয়ে জোনাইলবাসী এখন এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়।