প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ৪:৩৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ১১, ২০২৬, ৬:৩৪ পি.এম
বাংলাদেশে মুসলিম পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়

নিজস্ব প্রতিবেদন:
বাংলাদেশে মুসলিম পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়—এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছে হাইকোর্ট। তবে বিষয়টি স্ত্রী নয় বরং সংশ্লিষ্ট আরবিট্রেশন কাউন্সিলের এখতিয়ারভুক্ত হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ২৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত জানিয়েছেন, মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি প্রথম স্ত্রীর নয়, বরং সংশ্লিষ্ট আরবিট্রেশন কাউন্সিলের এখতিয়ারভুক্ত। বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করা যাবে না। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর এ বিধান বহাল রেখে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত এ রায়ের মাধ্যমে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ৬ ধারা বৈধ বলেই বহাল থাকল।
এর আগে ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়। ওই রিটে বলা হয়, বর্তমান আইন নারীর সাংবিধানিক অধিকার ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।
কী আছে আইনের ৬ ধারায়
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারায় বলা হয়েছে—
কোনো ব্যক্তির বিবাহ বলবৎ থাকলে সে সালিশি কাউন্সিলের লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবে না এবং অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো বিবাহ মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী নিবন্ধিত হবে না।
দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির জন্য চেয়ারম্যানের কাছে নির্ধারিত ফিসসহ আবেদন করতে হবে। আবেদনে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ ও বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করতে হবে।
আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারী ও বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রতিনিধি মনোনয়নের নির্দেশ দেবেন। গঠিত সালিশি কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত মনে করলে অনুমতি দিতে পারবেন।
সালিশি কাউন্সিলকে সিদ্ধান্তের কারণ লিখিতভাবে উল্লেখ করতে হবে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সহকারী জজের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যাবে, যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বিদ্যমান স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
রুল খারিজ, আইন বহাল
এ বিষয়ে হাইকোর্ট ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি রুল জারি করে জানতে চান—পারিবারিক জীবন রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে বহুবিবাহ বিষয়ে নীতিমালা কেন প্রণয়ন করা হবে না এবং স্ত্রীদের মধ্যে সমঅধিকার নিশ্চিত না করে বহুবিবাহের অনুমতির প্রক্রিয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।
শুনানি শেষে গত বছরের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুল খারিজ করেন। ফলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারা বহাল থাকে বলে জানান রিটকারীর আইনজীবী ইশরাত হাসান।
আপিলের ঘোষণা
তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তিনি বলেন, “এখানে নারীর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ইসলামে একাধিক বিবাহের অনুমতির সঙ্গে সবার প্রতি সমান সুবিচারের কঠোর শর্ত রয়েছে। কিন্তু বর্তমান আইনে সেই সুবিচার নিশ্চিত করার কার্যকর কোনো প্রভিশন নেই।”
তিনি আরও বলেন, আবেদনকারীর আর্থিক সামর্থ্য, দায়ভার পালনের সক্ষমতা বা বিয়ের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের পর্যাপ্ত ক্ষমতা সালিশি কাউন্সিলের নেই। মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশে এ প্রক্রিয়া আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে সাক্ষ্যগ্রহণ ও বাস্তব যাচাই করা হয়। এছাড়া কোনো চেয়ারম্যান নিজে দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে তাকেই নিজের অনুমতি দিতে হয়—যা স্বার্থসংঘাতের প্রশ্ন তোলে।
দৈনিক ঢাকা পত্র © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত