নিজস্ব প্রতিবেদক
লালপুরে ডাব খাইয়ে ফল ব্যবসায়ীর লাখ টাকা লুট: খুলনায় ধরা পড়ল কুখ্যাত ইমরান ও মুসা ডাবের সাথে বিষাক্ত চেতনানাশক কেমিক্যাল মিশিয়ে ফল ব্যবসায়ীদের অচেতন করে নগদ লাখ টাকা লুটের চাঞ্চল্যকর ঘটনার মূল হোতা ও আন্তঃজেলা পেশাদার প্রতারক ইমরান খান এবং তার অন্যতম সহযোগী আব্দুল মুসাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নাটোরের লালপুর থানা পুলিশের একটি চৌকস দল তথ্য-প্রযুক্তির নিখুঁত ব্যবহার ও সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা ও সোনাডাঙ্গা থানা এলাকা থেকে এই দুই কুখ্যাত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে।গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা অনুসন্ধানে তাদের ভয়ঙ্কর অপরাধের চিত্র উঠে এসেছে। আসামিরা হলো:১। মোঃ ইমরান খান (৩৭): সে নাটোর জেলার গুরুদাসপুর থানার ধারাবারিষা ইউনিয়নের উদবাড়িয়া গ্রামের মৃত আঃ রাজ্জাকের ছেলে (মাতা- ওছিরন বেগম)। তবে সে নিজ এলাকা ছেড়ে বর্তমানে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা থানার হেতালবুনিয়া এলাকায় জনৈক মোঃ বাদশা মিয়ার বাড়ি ভাড়া নিয়ে আস্তানা গেড়েছিল।২। মোঃ আব্দুল মুসা (৪২): সে খুলনা জেলার দাকোপ থানার টিলভাঙ্গা ইউনিয়নের বটবুনিয়া গ্রামের মোঃ আঃ হানিফের ছেলে। সে বর্তমানে খুলনা শহরের সোনাডাঙ্গা থানার বানরগাতিয়া এলাকার ১২৭/১৩ নম্বর রোডের তৃতীয় গলিতে মোছাঃ রোজীর বাড়ির জামাই হিসেবে বসবাস করে আসছিল।যেভাবে পাতা হয়েছিল প্রতারণার বিষাক্ত ফাঁদ:মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নাটোরের লালপুর থানার ১ নম্বর ওয়ার্ডের গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা মোঃ রাসেলের (২৬) সাথে ঈশ্বরপাড়া গ্রামের মোঃ শামীম হোসেনের (৩৫) অংশীদারিত্বে গোপালপুর রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় “ভাই ভাই ফল ভান্ডার” নামক একটি যৌথ ফলের দোকান রয়েছে। গত ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখ সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে তারা প্রতিদিনের ন্যায় দোকানে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। এমন সময় অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি নিজেকে ফল ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে পাইকারিতে ফল বিক্রির প্রস্তাব দেয় এবং তার সাথে থাকা ডাব, তরমুজ ও সামমামের কোয়ালিটি দেখায়।ধূর্ত এই প্রতারক প্রথমে তরমুজ ও সামমাম কেটে রাসেল ও শামীমকে খেয়ে পরীক্ষা করতে বলে এবং বিশ্বাস অর্জনের জন্য সে নিজেও খায়। ব্যবসায়ীরা ফল খেতে অপারগতা প্রকাশ করলে, ব্যক্তিটি তার সাথে থাকা ডাব পান করার জন্য বিশেষ অনুরোধ করে। সরল বিশ্বাসে তারা সেই ডাব পান করার কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই সুযোগে প্রতারক ব্যক্তিটি ব্যবসায়ী রাসেলের প্যান্টের পকেট থেকে দোকানের বিক্রির নগদ ১,৬৫,০০০/- (এক লাখ পয়ষট্টি হাজার) টাকা লুট করে কৌশলে চম্পট দেয়। পরবর্তীতে আশেপাশের লোকজন তাদের অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে মাথায় ও মুখে পানি ঢালেন এবং প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা পর তাদের চেতনা ফিরলে তারা বিস্তারিত জানতে পারেন। ঘটনার বিষয়ে আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে আলোচনা করে গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে লালপুর থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়।তদন্ত ও পুলিশের ঝটিকা অভিযান:মামলা দায়েরের পর লালপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মোঃ মনিরুল ইসলাম তদন্তভার গ্রহণ করেন। তিনি অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে ওইদিনই (১৬ সেপ্টেম্বর) লালপুর থানার জিডি নং-১০৩৪ মূলে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা ও সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় রাতভর অভিযান চালিয়ে এই দুই আসামিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ চেতনানাশক সামগ্রী ও অন্যান্য চোরাই মালামাল জব্দ করা হয়।থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপ:এই চক্রের ভয়ঙ্কর প্রতারণার বিষয়ে জানতে চাইলে লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, “মূল হোতা ইমরান খান কোনো সাধারণ চোর নয়, সে একজন পেশাদার ও চরম ধূর্ত প্রতারক। সে দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানা এলাকায় নিজের নাম-পরিচয় ও অবস্থান পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ফাঁদে ফেলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। সে একটি সুসংগঠিত অপরাধী সিন্ডিকেটের প্রধান। এই চক্রের বিষাক্ত প্রতারণার জাল ভেঙে দিতে এবং এদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।”ওসি আরও জানান, পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই কুখ্যাত চক্রটি ডাব খাইয়ে টাকা লুটের লোমহর্ষক ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের কঠোর পুলিশি পাহারায় বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এই চক্রের সাথে আর কোনো বড় সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে কিনা, তা উদঘাটনে পুলিশের কঠোর তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।(মামলার মূল সূত্র: লালপুর থানার মামলা নং-১৯, তারিখ-১৬/০৯/২০২৬ খ্রিঃ, ধারা-৩২৮/৩৭৯ পেনাল কোড, জিআর নং-২৬৩/২০২৬ (লালপুর)।)