বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন

বড়াইগ্রামে মাছ ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে চাঁদাদাবি: ভণ্ড কবিরাজ চক্রের ৪ সদস্য গ্রেফতার।
অনলাইন ডেস্ক / ২৩৬ বার
আপডেট টাইমঃ শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

 

মোঃ আনোয়ার হোসেন বড়াইগ্রাম নাটোর জেলা প্রতিনিধি, 

 

বড়াইগ্রাম মাছ বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে এক ব্যবসায়ীকে জিম্মি ও মারধর করে সাড়ে তিন লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগে নাটোরে বড়াইগ্রাম থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ৪ সদস্য। তবে এই গ্রেফতারের পর বেরিয়ে এসেছে থলের বিড়াল। চাঁদাবাজির মামলায় ফেঁসে যাওয়া এই চক্রটির তিন সদস্যের বিরুদ্ধে ভণ্ড কবিরাজি, ডিজিটাল ব্লাকমেইলিং এবং ইউটিউব প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই অপরাধীরা কীভাবে প্রশাসনের চোখের সামনে ‘জিরো থেকে হিরো’ বনে গেল, তা নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

চাঁদাবাজির সেই লোমহর্ষক ঘটনা:

বড়াইগ্রাম থানা পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মামলার বাদী আনিছুর রহমান একজন পেশাদার মাছ ব্যবসায়ী। গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এজাহারনামীয় আসামিরা তাকে মাছ বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে বড়াইগ্রাম থানাধীন চৌমুহন গ্রামস্থ একটি বাড়িতে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে পূর্ব থেকে ওত পেতে থাকা আসামিরা তাকে একটি কক্ষে আটকে রেখে জিম্মি করে এবং বেদম মারধর করে। এরপর আসামিরা বাদীর নিকট প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা মাসোহারা এবং তাৎক্ষণিকভাবে ৭ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। অন্যথায় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ী আনিছুর রহমান নগদ ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা আসামিদের হাতে তুলে দিয়ে কোনোমতে জীবন রক্ষা করেন।

উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বড়াইগ্রাম থানায় একটি নিয়মিত চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করেন। মামলা রুজুর পরপরই বড়াইগ্রাম থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিরস্ত্র) মোঃ জহুরুল ইসলাম চৌমুহনসহ বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে এজাহারনামীয় ৪ আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন। গ্রেফতারকৃতরা হলো— ৩ নং জোনাইল ইউনিয়নের মোঃ রুবেল হোসেন ওরফে ফ্রান্স রুবেল (৪০) (পিতা-মৃত ওয়াজেদ আলী), চৌমুহন গ্রামের মোঃ হারুন অর রশিদ (৩২) (পিতা-মোঃ দেলোয়ার হোসেন), এবং চরগোবিন্দপুর গ্রামের মোঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদের ছেলে মোঃ সাগর আহম্মেদ ওরফে সোহান হোসেন (২৮) ও মোঃ সোহাগ হোসেন (৩০)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা এই জিম্মি ও চাঁদাবাজির অপরাধ স্বীকার করেছে এবং তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

ভণ্ড কবিরাজি ও ইউটিউব প্রতারণার আড়ালে ‘আলাদিনের চেরাগ’:

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত রুবেল ও হারুন ছাড়া বাকি তিনজন অর্থাৎ— মোঃ সোহাগ হোসেন, মোঃ সোহান হোসেন এবং মোঃ সাগর আহম্মেদ (উভয়ের পিতা জিয়াউদ্দিন আহমেদ)—দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ‘ভণ্ড কবিরাজি’ ও জালিয়াতি সিন্ডিকেটের মূল হোতা। এরা ইউটিউবে বিভিন্ন অলৌকিক নাটক, জিন-ভূতের আছর ছাড়ানো এবং দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ের ভণ্ড ভিডিও ছড়াত। এই ডিজিটাল ফাঁদে পা দিয়ে দেশ-বিদেশের হাজারো সরলমনা মানুষ তাদের কাছে এসে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। চিকিৎসার নামে জিম্মি করে ও ব্লাকমেইল করে এরা হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই চক্রের অন্যতম হোতা ৩ নং জোনাইল ইউনিয়নের রুবেল হোসেন ওরফে ফ্রান্স রুবেল রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অপকর্মের ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, সে নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্যের সাবেক প্রতিনিধি হিসেবে এলাকায় দাপট দেখিয়ে বেড়াত। এই রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব ও প্রতারণার সাম্রাজ্য কায়েম করেছিল। এই অবৈধ টাকার উৎস কোথায় এবং এই চক্রের পেছনের গডফাদার কারা, তা খুঁজে বের করতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের কঠোর নজরদারি ও তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

পূর্বের ওসিতে অনীহা, বর্তমান ওসির ওপর এলাকাবাসীর আস্থা:

এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ইতিপূর্বেও সোহাগ, সোহান ও সাপ্তরের এই ভণ্ড কবিরাজি এবং ব্লাকমেইলিংয়ের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অতীতে বড়াইগ্রাম থানায় আসা-যাওয়া করা পূর্ববর্তী অফিসার ইনচার্জদের (ওসি) রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা ও গাফিলতির কারণে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তবে বর্তমান ওসির সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপের কারণে এই ভয়ঙ্কর চক্রের ৪ সদস্য অবশেষে ধরা পড়েছে। বর্তমান ওসির ওপর এলাকাবাসী গভীর ভরসা রাখছেন যে, তিনি কোনো চাপ বা প্রলোভনের কাছে মাথা নত না করে এই চক্রকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেবেন।

এ বিষয়ে বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম দৈনিক ঢাকা পত্র-কে বলেন, “অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য কোনো পরিচয় থাকতে পারে না। সে যার প্রতিনিধিই হোক বা যে দলেরই হোক না কেন, অপরাধ করলে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। মাছ ব্যবসায়ীকে জিম্মি করার অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথেই আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে অ্যাকশনে গিয়েছি এবং আসামিদের গ্রেফতার করেছি। তাদের চাঁদাবাজির পাশাপাশি ভণ্ড কবিরাজি ও ইউটিউব প্রতারণার যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য ও অভিযোগ সামনে আসছে, সেগুলোর বিষয়েও আমাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে। এই চক্রের সাথে জড়িত অন্য কাউকেও ছাড় দেওয়া হবে না। বাকি সহযোগীদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”

বাকিদেরও গ্রেফতারের দাবি:

স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, এই চক্রের আরও বেশ কিছু সক্রিয় সদস্য ও ইউটিউব জালিয়াতির কুশীলব এখনো লোকচক্ষুর আড়ালে ও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। জামিনে বেরিয়ে এসে আসামিরা যাতে আবারও এই ভণ্ড ব্যবসা চালু করতে না পারে, সেজন্য তাদের অবৈধ সম্পদের তদন্তসহ বাইরে থাকা বাকি সহযোগীদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোরালো দাবি জানিয়েছে বড়াইগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরো নিউজ
জনপ্রিয় পোস্ট
সর্বশেষ আপডেট