নিকোলাস বিশ্বাস
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ভিডিও দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ছোট শিশু পুকুরে ডুবে যাওয়ার সময় প্রাণপণ বাঁচার চেষ্টা করছে। পাশে থাকা আরেকটি শিশু অসহায়ের মতো চিৎকার করে সাহায্য চাইছে এবং পানিতে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে বন্ধুকে উদ্ধারের চেষ্টা করছে। আশপাশে বাড়িঘর থাকলেও কেউ সেই আর্তনাদ শুনতে পাননি। পরে এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে উদ্ধারচেষ্টা চালালেও শিশুটির পরিণতি ভিডিওতে আর জানা যায়নি।
এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের বাস্তবতারই নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যু ঘটছে। অধিকাংশ ঘটনাই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে আসে না, কিন্তু প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির নাম।
বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে মৃত্যু। অথচ এটি এখনো সবচেয়ে অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এসব মৃত্যুর বড় অংশই এড়ানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে প্রাণ হারান। এদের বড় অংশই শিশু ও কিশোর-কিশোরী। নদী, খাল, বিল, পুকুর ও জলাভূমিতে ঘেরা বাংলাদেশে এই ঝুঁকি বরাবরই বেশি। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যার প্রায় ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে।
বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস
আজ ২৫ জুলাই বিশ্ব ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’। ২০২১ সালে জাতিসংঘ এ দিবসের স্বীকৃতি দেয়। এবারের প্রতিপাদ্য “Unite to Turn the Tide”—অর্থাৎ ‘আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত থামাই।’ এই বার্তা শুধু একটি দিবসের প্রতিপাদ্য নয়, বরং শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকার।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে শিশুরা
জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। গ্রামীণ এলাকায় অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বাড়ির অদূরেই থাকা পুকুর, ডোবা কিংবা জলাশয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় অভিভাবকেরা গৃহস্থালি বা কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকায় শিশুরা অনেক সময় নজরদারির বাইরে চলে যায়। মাত্র দুই-তিন মিনিটের অসতর্কতাই একটি পরিবারের জীবনে বয়ে আনতে পারে চরম শোক।
পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর নীরবতা। বাস্তবে ডুবে যাওয়া শিশুরা অধিকাংশ সময় চিৎকার বা হাত নেড়ে সাহায্য চাইতে পারে না। তাই আশপাশের মানুষ টের পাওয়ার আগেই দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
কেন ঘটছে এত মৃত্যু?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অসংখ্য উন্মুক্ত জলাশয়, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, শিশুদের প্রতি পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং সাঁতার শেখার সুযোগের সীমাবদ্ধতা—এসব কারণ মিলেই পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা ও অতিবৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সহজ পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। যেমন—
ছোট শিশুদের কখনোই পানির ধারে একা না রাখা।
বাড়ির পাশের পুকুর ও জলাশয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা বা বেড়া নির্মাণ করা।
দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কমিউনিটি ডে-কেয়ার কেন্দ্র চালু করা।
বিদ্যালয়ে সাঁতার শিক্ষা ও পানি নিরাপত্তা বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা।
উদ্ধারকৌশল ও কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন (CPR) বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
বাংলাদেশে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (CIPRB)-এর ‘আঁচল’ ও ‘সুইমসেইফ’ কর্মসূচি ইতোমধ্যে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার কমাতে ইতিবাচক ফল দিয়েছে। ফলে সমাধানের পথ আমাদের জানা—এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, সরকারি বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই
পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ জরুরি।
পানিতে ডুবে মারা যাওয়া প্রতিটি শিশু একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের অপমৃত্যু। একজন সম্ভাব্য শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী কিংবা রাষ্ট্রনায়কের স্বপ্ন এভাবেই অকালেই নিভে যায়।
তাই বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগে সচেতনতা, নিরাপত্তা এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে হাজারো শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব।