বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন

চাটমোহরে দিনমজুরের মৃত্যুর ঘটনায় মিথ্যা মামলায় জড়ানোর অভিযোগ
অনলাইন ডেস্ক / ১০৮ বার
আপডেট টাইমঃ সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

 

মোঃ রাজিব হোসেন চাটমোর পাবনা প্রতিনিধি 

 

পাবনার চাটমোহরে তুচ্ছ ঘটনায় মারধরের শিকার হয়ে এক দিনমজুরের মৃত্যুর পর দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রামের অনেক নিরীহ মানুষকে মিথ্যাভাবে আসামি করার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন, ঘটনার সময় তাঁরা কেউ ঘটনাস্থলে ছিলেন না। কেউ মাঠে কাজে, কেউ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, কেউ প্রবাসে বা অন্যত্র ছিলেন। অথচ তাঁদের নাম হত্যা মামলায় যুক্ত করা হয়েছে। মামলার বাদী নিজেও ঘটনার দিন এলাকায় ছিলেন না বলে অভিযোগ।

 

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চাটমোহর উপজেলার পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের সজনাই গ্রামে গিয়ে ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

 

মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ আগস্ট সজনাই গ্রামের সোবাহান আলীর ছেলে আব্দুল বারেক ওরফে বাকি তাঁর পাঁঠা ছাগলকে বাড়ির পাশের একটি পুকুরে গোসল করাতে নিয়ে গেলে প্রতিবেশী জাহের মোল্লার ছেলে রবিউল ইসলাম রবি বাধা দেন। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রবি ও তাঁর স্ত্রী রেশমা বাকিকে বাঁশ ও কাঠের বাটাম দিয়ে মারধর করেন। মাথায় আঘাত পেয়ে বাকি রক্তাক্ত হন। তাঁকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় তিনি মারা যান।

 

এ ঘটনায় নিহত বারেকের চাচা ওয়াহাব প্রামাণিক বাদী হয়ে চাটমোহর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় রবি ও তাঁর স্ত্রী রেশমাসহ মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়। এরই মধ্যে প্রধান দুই আসামি রবি ও রেশমাকে গত ১১ সেপ্টেম্বর রাতে র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে।

 

এলাকাবাসীর অনেকে বলছেন, মামলায় সজনাই গ্রামের কয়েকজন সাধারণ মানুষকে আসামি করা হয়েছে, যাঁদের ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এমনকি ঘটনার সময় তাঁরা ঘটনাস্থলে উপস্থিতও ছিলেন না। ফলে তাঁরা আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং পরিবারগুলো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে।

 

মামলায় অভিযুক্ত জাকির ও মতিনের ভাই আলহাজ্ব লুৎফর রহমান হাসু বলেন, “এজাহারে বলা হয়েছে জাকির, মতিন, মাহমুদ, উজ্জল, আওয়াল ও মোস্তব উপস্থিত থেকে বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম দিয়ে বাকিকে আঘাত করে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মাহমুদ আলী প্রবাসী। তিনি ১৫ দিন আগে কুয়েত থেকে এসে রংপুরে আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন। জাকির চাটমোহরে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কাজে, মতিন পার্শ্বডাঙ্গা বাজারে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এবং অন্যরা মাঠে পাটের আঁশ ছড়ানোর কাজে ছিলেন।”

 

স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল হাসান বর্ষণ বলেন, “নিহত বাকির আত্মীয় দেলোয়ার ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত হয়ে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেন এবং সবকিছু জানেন। তিনি নিরীহ মানুষকে আসামি করার বিরোধিতা করায় অন্যায়ভাবে তাঁকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। বাদী ওয়াহাব প্রামাণিক ২৫ বছর আগে এলাকা ছেড়ে ঢাকায় বসবাস করেন। তিনি ঘটনার দিন এলাকায় ছিলেন না। অথচ ঢাকা থেকে এসে মামলার বাদী হয়েছেন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এলাকার কিছু মানুষকে হয়রানি করতে আসামি করেছেন।”

 

শফি উদ্দিন প্রামানিক বলেন, “উজ্জল নামের ছেলেটিকে আসামি করা হয়েছে। সেদিন সে আমার সঙ্গে পাট ছোলার কাজে ছিল। সে কিছুই জানে না। আমরা চাই দোষীরাই শাস্তি পাক, কিন্তু কোনো নিরীহ মানুষকে যেন হয়রানি করা না হয়। ঘটনার সত্যতা উদঘাটনে পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্ত ও এলাকাবাসীর জবানবন্দি নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”

 

প্রবাসী মাহমুদ আলীর স্ত্রী ছুম্মা খাতুন বলেন, “স্বামী দেশে আসার পর ছেলেকে বিয়ে দিয়েছি। আমরা পরিবারসহ নীলফামারী বেয়াই বাড়িতে ছিলাম। সেখানে থাকাকালে শুনি এলাকায় মারামারি হয়েছে এবং একজন মারা গেছেন। বাড়িতে আসার চেষ্টা করছিলাম। এর মধ্যে শুনি মার্ডার মামলায় স্বামীকেও আসামি করা হয়েছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”

 

মামলার বাদী ওয়াহাব প্রামাণিক বলেন, “ওরা প্রতাপশালী লোক। ওরা অনেককে মারছে। আমরা কাউকে মারতে পারিনি, মার খেয়ে এসেছি। মতিন, জাকির ওরা মারার হুকুম দিয়েছে। মারার হুকুম দিলে কি ওরা আসামি হয় না?” হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যাদের বলছে তারাই আমাদের বলছে।” ঘটনার দিন তিনি এলাকায় ছিলেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন যে, ওইদিন এলাকায় ছিলেন না।

 

চাটমোহর থানার ওসি অলিউর রহমান বলেন, “ইতিমধ্যে মামলার প্রধান দুই আসামি রবি ও তাঁর স্ত্রী রেশমাকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করে আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। আমরা তাঁদের আদালতে সোপর্দ করেছি। মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা মিলবে, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে। কিন্তু পুলিশ নিরীহ বা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়—এমন মানুষদের হয়রানি করবে না।”

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরো নিউজ
জনপ্রিয় পোস্ট
সর্বশেষ আপডেট