বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৭ অপরাহ্ন

চুরির নাটক থেকে ধর্ষণের মামলা টুঙ্গিপাড়ায় কিশোরীর সন্তান প্রসব ও আসল পিতা নিয়ে ঘনীভূত রহস্য
অনলাইন ডেস্ক / ৯১ বার
আপডেট টাইমঃ শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

 

 

মোঃ শান্ত শেখ টুঙ্গিপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি

 

 

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৩ বছরের এক কিশোরীর (রুপা, ছদ্মনাম) ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়েরের আড়াই মাস পর ওই কিশোরী কন্যা সন্তান প্রসবের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। চুরির অপবাদ থেকে শুরু হয়ে ধর্ষণের মামলায় রূপ নেওয়া এই ঘটনায় ফেঁসে গেছেন ২১ বছরের যুবক সাগর শেখ। তবে মামলার এজাহার, মেডিকেল রিপোর্ট এবং পরিবারের রহস্যজনক আচরণে প্রশ্ন উঠেছে আসল অপরাধী কে? আইন ও বিজ্ঞানের তথ্য বলছে, এজাহারে উল্লিখিত সময়ের সাথে কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কোনো মিল নেই।

 

 

তদন্তে জানা গেছে, গত ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সকালে কিশোরীর নানা ইউনুস বেপারী প্রথমে তার মেজো ভায়রা মোঃ মশিউল ইসলাম সোহাগের কাছে অভিযোগ করেন যে, তার ঘর থেকে ভাঙারি তামা ও পিতল চুরি হয়েছে। শুরুতে তিনি চোর হিসেবে সাগরের নাম বলেন। কিন্তু দুপুর গড়াতেই চুরির সেই অভিযোগ গায়েব হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই সাগর শেখের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলা হয়।

 

মশিউল ইসলাম সোহাগ জানান, ইউনুস বেপারী প্রথমে বলেছিলেন ঘর চুরি হয়েছে। পরে যখন জিজ্ঞেস করলাম তিনি কাউকে দেখেছেন কি না, তখন তিনি একেক সময় একেক কথা বলছিলেন। বিকেলের দিকে হঠাৎ চুরির ঘটনা পাল্টে ধর্ষণের গল্প সাজানো হয়।

 

 

গত ৭ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়া থানায় দায়ের করা মামলায় (মামলা নং ৫) অভিযোগ করা হয়, ৫ ডিসেম্বর রাতে সাগর শেখ ঘরের টিনের বেড়া কেটে রুপাকে ধর্ষণ করে। কিন্তু ৯ ডিসেম্বর ডাক্তারী পরীক্ষায় চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন যে, রুপা তখন ২৪ সপ্তাহের (৬ মাস) অন্তঃসত্ত্বা।

 

৫ ডিসেম্বরের কথিত ঘটনার মাত্র ২ দিন পর ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসম্ভব। এর অর্থ, রুপা আগে থেকেই অন্তঃসত্ত্বা ছিল, যা মামলার এজাহারকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে।

 

 

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য এবং মশিউল ইসলাম সোহাগের বর্ণনা অনুযায়ী, রুপা তার নানা ইউনুস বেপারীর বাড়িতে গত ৬ মাস ধরে থাকছে। সেখানে তারা একই ঘরে, এমনকি একই বিছানায় ও একই লেপের নিচে ঘুমানোর তথ্যও উঠে এসেছে। সাগর শেখের পরিবারের দাবি, নানা-নাতনির এই অতি-ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি ধামাচাপা দিতেই সাগরকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। সাংবাদিকরা এ বিষয়ে ইউনুস বেপারীকে প্রশ্ন করলে তিনি চড়াও হন এবং রুপার মাকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যান।

 

মামলা করার মাত্র ৫ দিন পর রুপাকে তার খালাতো ভাই রাকিবের সাথে বিয়ে দেওয়ার দাবি করে পরিবার। কিন্তু ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাতে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সন্তান প্রসবের সময় হাসপাতালের নথিতে স্বামীর নাম লেখা হয় জাকির। পরিবারের কেউই এই জাকির এর পরিচয় দিতে পারেনি। আবার বিয়ের মাত্র আড়াই মাসের মাথায় পূর্ণাঙ্গ সন্তান প্রসব করায় রাকিবের পিতৃত্বের দাবিও ধোপে টিকছে না।

 

 

অভিযোগ উঠেছে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি সালিশে ৬০ হাজার টাকা ও ২ শতাংশ জমির বিনিময়ে মামলা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইউনুস বেপারী। এছাড়া সন্তান প্রসবের পরদিনই (২৫ ফেব্রুয়ারি) ভোরে নবজাতককে নিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান রুপা ও তার মা। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৮০ হাজার টাকায় নবজাতকটিকে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে তারা ঢাকার পথে রওনা হয়েছিলেন, কিন্তু ধরা পড়ার ভয়ে বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। এ বিষয়ে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রুঙ্গু খান বলেন, এলাকায় এমন একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা আমি জানিনা, উভয় পরিবারের কেউ আমাকে কিছু জানায়নি।

 

 

সাগর শেখের পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, প্রাথমিক সত্যতা যাচাই না করেই সাগরকে আদালতে চালান করা হয়েছে।

 

তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) জানিয়েছেন, মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এর প্রেক্ষাপট বেশ জটিল। আমরা প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য সংগৃহীত নমুনা সিআইডিতে (CID) পাঠিয়েছি। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। ভুক্তভোগী কিশোরী আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। সেখানে সে উল্লেখ করেছে যে, তার খালাতো ভাই রাকিবের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল এবং গর্ভাবস্থায় সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যেহেতু সে রাকিবকে অভিযুক্ত করেছে, তাই আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব। আদালত নির্দেশ দিলেই কেবল রাকিবের ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

মামলার ৫ দিন পর তড়িঘড়ি করে রাকিবের সঙ্গে ভিকটিমের বিয়ের বিষয়টি আমরা শুনেছি। তবে নবজাতকের জন্মের সময় হাসপাতালের নথিতে স্বামীর জায়গায় কেন জাকির নামের এক ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হলো, সে বিষয়টি আমি জানিনা, এই জাকির আসলে কে, স্থানীয়ভাবে ভিকটিমের নানার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। আমরা প্রতিটি তথ্যই গুরুত্বের সাথে দেখছি। তবে আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো বর্তমান ডিএনএ রিপোর্টটি পাওয়া। যদি সংগৃহীত নমুনার সাথে প্রাথমিক সন্দেহের মিল না পাওয়া যায়, তবে আদালতের অনুমতি নিয়ে নানার ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা হবে। স্থানীয়ভাবে বা পারিবারিকভাবে তারা বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করতে পারেন, কারণ তারা পরস্পর আত্মীয়। কিন্তু পুলিশের তদন্তে বা আইনি প্রক্রিয়ায় এ ধরনের অপরাধে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।

 

 

১৩ বছরের একটি শিশুর ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকারের মুখে। একদিকে সাগর শেখ কারাগারে ন্যায়বিচারের আশায়, অন্যদিকে আসল অপরাধী হয়তো এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই রহস্যের জট খুলতে ডিএনএ টেস্টের ফলাফল এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরো নিউজ
জনপ্রিয় পোস্ট
সর্বশেষ আপডেট