বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৪ অপরাহ্ন

বড়াইগ্রামের আঁধার ও দেশের বিদ্যুৎ সংকট: উন্নয়নের চাকায় জ্বালানি সংকটের কঠিন ব্রেক
অনলাইন ডেস্ক / ৫৭ বার
আপডেট টাইমঃ শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

 

বড়াইগ্রাম প্রতিনিধি, (নাটোর): 

এক দশকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের যে মাইলফলক বাংলাদেশ স্পর্শ করেছিল, তা আজ যেন এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর গৌরবগাথা এখন ম্লান হয়ে যাচ্ছে নাটোরের বড়াইগ্রামসহ সারা দেশের গ্রাম ও জনপদে চলা দীর্ঘ ও দুঃসহ লোডশেডিংয়ের কবলে। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকায় যখন বিদ্যুতের সামান্য আসা-যাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়, ঠিক তখন নাটোরের বড়াইগ্রামের মফস্বল পাড়ায় বা কৃষি খামারে অন্ধকার নেমে আসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গত কয়েক মাস ধরে এই উপজেলায় বিদ্যুতের পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ এখন বিদ্যুতের আসার চেয়ে যাওয়ার সময়টিই বেশি মনে রাখতে পারছে। সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার পরেও জ্বালানির অভাবে কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা বা উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ। বড়াইগ্রামের প্রতিটি ঘরে আজ তীব্র ক্ষোভ আর হাহাকার। বনপাড়া পৌরসভা থেকে শুরু করে মাঝগাঁও বা জোনাইলের মতো এলাকাগুলোতে দিনরাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং এখন স্বাভাবিক ঘটনা। তীব্র গরমে যখন জনজীবন অতিষ্ঠ, তখন বিদ্যুতের এই লুকোচুরি কেবল শারীরিক কষ্টই বাড়াচ্ছে না, বরং মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করে তুলছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সামনে যাদের বোর্ড পরীক্ষা বা বার্ষিক পরীক্ষা, তারা মোমবাতির আলোয় কতক্ষণই বা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর এই প্রজন্মের কাছে ইন্টারনেটের যুগে বিদ্যুতহীন থাকার অর্থ হলো পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া।

বড়াইগ্রামের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো কৃষি। এই কৃষি আজ বিদ্যুতের অভাবে খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। উত্তরাঞ্চলের এই জনপদে ধান ও মৌসুমি ফসল উৎপাদনে সেচ পাম্পের ওপর কৃষকদের নির্ভরতা অনেক বেশি। কিন্তু সেচ দেওয়ার সময়েই যদি বিদ্যুৎ না থাকে, তবে ফসলের মাঠ শুকিয়ে ধুধু প্রান্তরে পরিণত হয়। কৃষকরা অভিযোগ করছেন যে, গভীর ও অগভীর নলকূপগুলো সচল করার জন্য বিদ্যুতের যে নির্দিষ্ট ভোল্টেজ বা নিরবচ্ছিন্নতা প্রয়োজন, তা তারা পাচ্ছেন না। ফলে ফসলের ফলন কমছে এবং বাধ্য হয়ে অনেক চাষি বেশি দামে ডিজেল কিনে মেশিন চালাচ্ছেন। এতে চাষাবাদের খরচ এত বেশি বেড়ে যাচ্ছে যে, ফসল বিক্রি করে লাভের মুখ দেখা কৃষকদের জন্য এখন দুঃস্বপ্ন। কেবল কৃষি নয়, উপজেলার ক্ষুদ্র ও মাঝারি কলকারখানাগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। বনপাড়া এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। শ্রমিকরা বসে থাকছেন অলস সময় পার করে, কিন্তু দিনের শেষে তাদের মজুরি ঠিকই গুনতে হচ্ছে মালিকপক্ষকে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং অনেক উদ্যোক্তা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার চিন্তা করছেন। ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা বা কর্মচারীদের বেতন দেওয়া এখন তাদের জন্য পাহাড়সম বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বলছে, চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ অর্ধেকেরও কম মেলায় তারা লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু এই যুক্তি সাধারণ গ্রাহকদের মন ভোলাতে পারছে না। তারা বলছেন, বিলে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না, উল্টো দাম বাড়ানো হয় বারবার, অথচ সেবা পাওয়ার বেলায় তারা চরম বৈষম্যের শিকার।

জাতীয় পর্যায়ে এই সংকটের মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ আজ বড় ধরনের জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটে ভুগছে। এক সময় দেশে নিজস্ব গ্যাসের প্রাচুর্য থাকলেও এখন তা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির কারণে আজ ডলার সংকটের সময় দেশ এই বিপদে পড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির আকাশচুম্বী দাম এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ডলার সংকটের কারণে কয়লা ও গ্যাস আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে। পায়রা বা রামপালের মতো মেগা প্রজেক্টগুলো যখন কয়লার অভাবে উৎপাদন কমিয়ে দেয়, তখন তার প্রভাব সুদূর বড়াইগ্রামের অন্ধকার পল্লি পর্যন্ত পৌঁছায়। এর ওপর রয়েছে বিতরণ ব্যবস্থার পুরনো অবকাঠামো। অনেক জায়গায় জরাজীর্ণ ট্রান্সফরমার বা লাইনের ত্রুটির কারণে সামান্য বৃষ্টি বা বাতাসেই বিদ্যুৎ চলে যায়। গ্রামীণ গ্রাহকরা মনে করছেন, রাজধানীর তুলনায় মফস্বল এলাকায় বিদ্যুতের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে। অথচ দেশের খাদ্য উৎপাদনের সিংহভাগ আসে এই গ্রামগুলো থেকেই। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এই সংকট এক অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ স্থানীয় ক্লিনিকগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় জরুরি অপারেশন থিয়েটারগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ সময়b জেনারেটর চালানো অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই সম্ভব হয় না। ফ্রিজে রাখা দামি ইনসুলিন বা ভ্যাকসিন নষ্ট হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। গরমে হাসপাতালেও রোগীরা হাঁসফাঁস করছেন।

বিদ্যুৎ সংকটের এই আঁধার কেবল বড়াইগ্রামের নয়, এটি আজ সারা বাংলাদেশের এক জাতীয় সমস্যা। শহরের কলকারখানা থেকে শুরু করে গ্রামের কৃষি—সবই আজ এই সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বা অফিস সময় কমিয়ে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিজস্ব খনিজ সম্পদ উত্তোলনে সাহসী পদক্ষেপ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর। সৌরবিদ্যুৎ বা বায়ুবিদ্যুতের মতো খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে আমদানিনির্ভরতা অনেকটা কমানো সম্ভব হতো। নাটোরে যেহেতু প্রচুর রোদ এবং খোলা জায়গা আছে, সেখানে সৌর পার্ক স্থাপনের চিন্তা করা যেতে পারে যা স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবে। সরকার শতভাগ বিদ্যুতায়নের যে লক্ষ্য পূরণ করেছিল, তাকে টেকসই করতে হলে এখন জ্বালানি সরবরাহে কঠোর পরিকল্পনা প্রয়োজন। বড়াইগ্রামের মানুষ আজ দাবি তুলছে, তাদের প্রতি এই বিদ্যুৎ বৈষম্য বন্ধ করা হোক। তারা নিয়মিত বিল পরিশোধ করে অন্ধকার নয়, বরং আলো চায়। আলোর অভাবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি পিছিয়ে পড়ে এবং কৃষিখাত যদি মুখ থুবড়ে পড়ে, তবে সামগ্রিক উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সুতরাং সময় এসেছে কেবল অবকাঠামো তৈরির দিকে নজর না দিয়ে জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগী হওয়ার। নতুবা লোডশেডিংয়ের এই দীর্ঘ অন্ধকার বাংলাদেশের অর্থনীতির উদীয়মান সূর্যকে মেঘে ঢেকে দিতে পারে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডলার ও জ্বালানি সংকট কাটিয়ে সরকার বড়াইগ্রামসহ সারা দেশের মানুষের জীবনে নিরবচ্ছিন্ন আলোর নিশ্চয়তা ফিরিয়ে আনবে।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরো নিউজ
জনপ্রিয় পোস্ট
সর্বশেষ আপডেট