মাসুদ রানা রাজশাহী নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন ‘রাকাব অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন’ নিয়ে প্রকাশ্যে এসেছে তীব্র বিরোধ। সংগঠনটির নেতৃত্ব দখলকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠনের অভিযোগ উঠেছে। একটি পক্ষের দাবি, বিদ্যমান কমিটির অনুমোদন ও সাধারণ সভা ছাড়াই সংগঠনের নামে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে সংগঠনের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের পাশাপাশি ব্যাংকের ভেতরে পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাকাবে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের কর্মকর্তাদের উদ্যোগে গঠিত সংগঠনটির নেতৃত্ব দখলের জন্য একটি মহল তৎপর হয়ে উঠেছে। তাঁদের অভিযোগ, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার, নিজেদের অনুসারীদের পুনর্বাসন এবং ভিন্নমতের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাকাবের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি সাধারণ সভার মাধ্যমে ‘রাকাব অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর কেন্দ্রীয় অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। ব্যাংকের শতাধিক কর্মকর্তার সম্মতিতে ডিজিএম মোঃ জিয়াউদ্দিন আকবরকে আহ্বায়ক এবং এজিএম মোঃমোস্তাফিজুর রহমান সরকারকে সদস্যসচিব করা হয়।
পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় অ্যাডহক কমিটির আহ্বায়কের অনুমোদনে ডিজিএম মোঃ মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করে প্রধান কার্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। পর্যায়ক্রমে রাকাবের ১৮টি জোনেও অ্যাডহক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট রাজশাহীর ম্যাংগো রিসোর্টে কেন্দ্রীয়, প্রধান কার্যালয় ও ১৮টি জোনের অ্যাডহক কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে সংগঠনটির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর চলতি বছরের ৮ মার্চ রাকাবের প্রধান কার্যালয় চত্বরে ইফতার মাহফিল ও সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজনে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নেন।
‘হঠাৎ করে কমিটি, অনেকেই জানেন না’
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক ডিজিএম মো. জিয়াউদ্দিন আকবর অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে রাকাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতেই ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সংগঠনটি গড়ে তোলা হয়।
জিয়াউদ্দিন আকবর বলেন আমরা চেয়েছিলাম কর্মকর্তাদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর সংগঠন গড়ে তুলতে। কিন্তু সংগঠনটি গঠনের পরও একটি মহলের তৎপরতা থামেনি।
তাঁর দাবি গত ২০ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের লক্ষ্যে আগামী ২৯ আগস্ট সাধারণ সভা আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এর পরদিনই সংগঠনের নামে একটি নতুন কমিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়।
জিয়াউদ্দিন আকবরের প্রশ্ন যাঁরা ওই কমিটিতে আছেন বলে দেখানো হয়েছে তাঁদের অনেকেই কমিটি সম্পর্কে জানেন না। তাঁদের সম্মতি ছাড়া নাম কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
ইস্তফার এক মাস পরই ‘সভাপতি’!
কমিটি নিয়ে বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিএম মো. মিজানুর রহমানের পদত্যাগপত্র। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ জুলাই মিজানুর রহমান রাকাব অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কার্যালয় কমিটির আহ্বায়ক পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক জিয়াউদ্দিন আকবরের কাছে লিখিত আবেদন করেন।
ওই আবেদনে তিনি সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি ও প্রধান কার্যালয় কমিটি দুটি কমিটি সক্রিয় থাকার কথা উল্লেখ করেন এবং শারীরিক অসুস্থতা ও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে প্রধান কার্যালয় কমিটির আহ্বায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন।
অভিযোগকারীদের দাবি এর পরের মাসেই তিনি নিজেকে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করে একটি কমিটি প্রকাশ করেন। এ নিয়েই এখন সংগঠনের ভেতরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারণের বৈধ প্রক্রিয়াটি কী ছিল।
কর্মকর্তাদের ফোন করে চাপ দেওয়ার অভিযোগ
রাকাবের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন নতুন কমিটিতে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁদের কেউ কেউ ফোন পেয়েছেন। কাউকে চা পানের কথা বলে ডেকে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি তাঁদের। নতুন কমিটিতে যুক্ত না হলে বদলি কিংবা খারাপ এসিআর দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য ব্যাংকের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ গোলাম মরতুজা, জিএম তাজ উদ্দিন আহমেদ ডিজিএম মোঃ মিজানুর রহমান ও ডিজিএম মোঃ শাহিনুর ইসলামের বিরুদ্ধে এ ধরনের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
রাকাবের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ গোলাম মরতুজাকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগও সামনে
কমিটি নিয়ে বিরোধের মধ্যে ডিজিএম মোঃ মিজানুর রহমান ও ডিজিএম মোঃ শাহিনুর ইসলামকে ঘিরে অতীতের বিভিন্ন অভিযোগও সামনে এনেছেন সংগঠনটির এক পক্ষ।
মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগে অনিয়ম ও নারীসংক্রান্ত নানা অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, ২০ আগস্ট ডিজিএম মোঃ শাহিনুর ইসলামকে সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। বহিষ্কারাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ড ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কোনো কার্যক্রমে অংশ না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শাহিনুর ইসলামের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, আর্থিক অনিয়ম ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংগঠনের এক পক্ষ। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই মেলেনি।
গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের অভিযোগ
রাকাব সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিদ্যমান কমিটির অনুমোদন ছাড়া এবং সাধারণ সভা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, এতে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ১৩(২)(ক) ১৫(ক) ১৮(ক)(খ) ও ১৯ ধারার লঙ্ঘন হয়েছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত অনেক কর্মকর্তার কাছ থেকে কোনো লিখিত সম্মতি নেওয়া হয়নি। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটিকে তাঁরা ‘গঠনতন্ত্রবিরোধী ও অকার্যকর’ বলে দাবি করছেন।
সংগঠনটির সদস্যসচিব সৈয়দ খায়রুল ইসলাম বলেন, ২১ আগস্ট এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। সেখানে রাকাব অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের নাম ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গ্রুপে একটি কমিটির তালিকা প্রচারের কথা উল্লেখ করে সদস্যদের বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
২৯ আগস্টের সাধারণ সভাই কি সমাধানের পথ
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক জিয়াউদ্দিন আকবরের ২০ আগস্টের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের লক্ষ্যে ২৯ আগস্ট সাধারণ সভা আহ্বান করা হয়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে, সাধারণ সভার আগেই পৃথক কমিটি ঘোষণা করে সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির প্রয়োজন কেন হলো।
রাকাবের কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, বিষয়টি দ্রুত সাংগঠনিক ও প্রশাসনিকভাবে নিষ্পত্তি করা না হলে এর প্রভাব ব্যাংকের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডেও পড়তে পারে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের লড়াইয়ের বদলে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত স্বার্থ এবং রাকাবের মূল দায়িত্ব—কৃষক, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ কৃষি ও কৃষক আন্দোলন এবং জুলাই-৩৬ পরিষদের আহ্বায়ক মাহমুদ জামাল কাদেরী বলেন, “রাকাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে কৃষকের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তিনি বলেন, রাকাবের উন্নয়ন ও কৃষকদের সেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো পক্ষ যদি সংগঠন বা ব্যাংকের পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে তার বিরুদ্ধে তাঁরা সোচ্চার হবেন।
রাকাব উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়ে চলমান এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত শুধু কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি ব্যাংকের প্রশাসনিক কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়বে এখন সেটিই দেখার বিষয়।