সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৬ পূর্বাহ্ন

ইউটিউবে ভুয়া কবিরাজি ও গুপ্তধনের মরণফাঁদ: নাটের গুরু নাটোরের বড়াইগ্রাম! প্রবাসীদের কোটি কোটি টাকা লুটে নিলেও নির্বিকার প্রশাসন
অনলাইন ডেস্ক / ৬১ বার
আপডেট টাইমঃ শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

 

বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি:

বিদেশে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জিত প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের কোটি কোটি টাকা অনায়াসেই গিলে খাচ্ছে দেশের একশ্রেণীর সংঘবদ্ধ ও জঘন্য সাইবার প্রতারক চক্র। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবকে (YouTube) তারা বানিয়েছে লুণ্ঠনের প্রধান হাতিয়ার। চটকদার বিজ্ঞাপন, ভুয়ো ব্যবসার অফার, তথাকথিত অলৌকিক কবিরাজি আর এবার মাটির নিচ থেকে ‘গুপ্তধন তুলে দেওয়া’র প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত করা হচ্ছে হাজারো রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ঘৃণ্য অপরাধের অন্যতম প্রধান আখড়া ও তথ্যসূত্র মিলেছে নাটোরের বড়াইগ্রাম এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য দিবালোকে এই নির্মম ডিজিটাল ডাকাতি চললেও তা দমনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সাইবার ক্রাইম বিভাগের চরম উদাসীনতা ও রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চক্রগুলোর মূল টার্গেট মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ইউরোপ-আমিকায় থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা। প্রবাস জীবনের একাকীত্ব, শারীরিক অসুস্থতা, পারিবারিক অশান্তি কিংবা রাতারাতি ভাগ্য বদলানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে নিখুঁত ব্ল্যাকমেইলিং ও প্রতারণার জাল বিছিয়েছে এই সাইবার অপরাধীরা।

যেসব জঘন্য কৌশলে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পকেট কাটছে প্রতারকেরা:

• গুপ্তধন পাইয়ে দেওয়ার ভয়ঙ্কর টোপ: প্রতারণার নতুন ও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কৌশল হলো ‘মাটির নিচ থেকে জিনের সাহায্যে গুপ্তধন বা স্বর্ণের কলস তুলে দেওয়া’। ইউটিউবে চকচকে ভুয়া স্বর্ণের মূর্তির ভিডিও দেখিয়ে প্রবাসীদের অন্ধবিশ্বাসের সুযোগ নেওয়া হয়। এরপর গুপ্তধন তোলার জন্য ‘বিশেষ পুজো’ বা ‘যাগযজ্ঞের দামি সামগ্রী’ কেনার বাহানায় ধাপে ধাপে প্রবাসীদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে নাটোরের বড়াইগ্রাম ভিত্তিক এই চক্রগুলো। টাকা দেওয়ার পর গুপ্তধন তো দূরের কথা, উল্টো প্রবাসীদের পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আরও টাকা দাবি করা হয়।

• ডিজিটাল কবিরাজি ও জিনের বাদশার ফাঁদ: ইউটিউব স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে ‘এক রাতেই কঠিন রোগ থেকে মুক্তি’, ‘জিন-পরীর সাহায্যে লটারি জয়ের আমল’ কিংবা ‘দূর প্রবাস থেকে কাঙ্ক্ষিত মানুষকে বশ করার জাদুকরী তদবির’। ভিডিওর নিচে দেওয়া ইমো বা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করলেই শুরু হয় আসল খেলা। প্রথমে অল্প টাকা নিয়ে ‘তদবির’ শুরু করলেও পরে ‘পরিবারের বড় ক্ষতি হবে’ এমন ভয় দেখিয়ে ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

• ভুয়া বিনিয়োগ ও ব্যবসার ছদ্মবেশ: ‘স্বল্প পুঁজিতে দেশে নিশ্চিত মুনাফা’র লোভ দেখিয়ে আকর্ষণীয় ভিডিওর মাধ্যমে প্রবাসীদের আকৃষ্ট করা হয়। প্রবাসীরা সরল বিশ্বাসে কষ্টার্জিত জমানো টাকা পাঠানোর পর রাতারাতি সেই চ্যানেল ও মোবাইল নম্বর বন্ধ হয়ে যায়।

উদাসীন প্রশাসন, অরক্ষিত প্রবাসী: আর কতকাল ঘুমাবে সাইবার ক্রাইম বিভাগ?

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জাজনক বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রবাসীদের এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে লুটেপুটে খাওয়া হলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কিংবা প্রশাসনের কোনো জোরালো তৎপরতা নেই। নাটোরের বড়াইগ্রামের মতো নির্দিষ্ট কিছু এলাকা থেকে কীভাবে বছরের পর বছর এসব ভণ্ড কবিরাজ ও প্রতারক চক্র ইউটিউবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে, তা নিয়ে জনগণের মনে হাজারো প্রশ্ন উঠেছে। এই নির্বিকার ভূমিকা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে কোনো ইউটিউব ভিডিও দেখে অলৌকিক উপায়ে রোগমুক্তি, বশীকরণ কিংবা মাটির তলা থেকে গুপ্তধন পাওয়ার আশা করা চরম বোকামি ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। প্রবাসীদের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন—এইসব ভণ্ড, প্রতারক ও জিনের বাদশা দাবিদারদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে নিজের কষ্টের টাকা তুলে দেবেন না।

একই সাথে প্রশাসনের প্রতি আমাদের তীব্র ও আলটিমেটামযুক্ত দাবি, নাটোরের বড়াইগ্রামসহ দেশের যেখানেই এই তথাকথিত ডিজিটাল অপরাধীদের ডেরা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে অবিলম্বে চিরুনি অভিযান চালানো হোক। প্রবাসীদের রক্ত পানি করা টাকা এভাবে লুটেরাদের পেটে যেতে দেওয়া যায় না। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর না হয়, তবে এই সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরো নিউজ
জনপ্রিয় পোস্ট
সর্বশেষ আপডেট