সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৯ অপরাহ্ন

পার্বত্য বৌদ্ধসমাজে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো অবদান 
অনলাইন ডেস্ক / ৩৪ বার
আপডেট টাইমঃ সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

 

সঞ্চয় বিকাশ তঞ্চঙ্গ্যা বিলাইছড়ি (রাঙ্গামাটি) প্রতিনিধি:

পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধধর্ম, শিক্ষা, সমাজ সংস্কৃতি ও মানবকল্যাণে অনন্য অবদান রাখা রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ বৌদ্ধ পণ্ডিত, ধর্মীয় সংগঠক, সাহিত্যিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংঘনায়ক। তাঁর জীবন ও কর্ম তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়সহ পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের কাছে চিরস্মরণীয়।

জন্ম ও শিক্ষা: ১৯১৩ সালের ২৩ নভেম্বর রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার কুতুবদিয়া গ্রামে বিশিষ্ট জমিদার ও কার্বারি রুদ্রসিং তঞ্চঙ্গ্যা এবং ইচ্ছাবতী তঞ্চঙ্গ্যার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন ফুলনাথ তঞ্চঙ্গ্যা। পরবর্তী জীবনে তিনি রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো নামে পরিচিতি লাভ করেন। শৈশব থেকেই ধর্মীয় শিক্ষা ও পালি ভাষা-সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।

ধর্মীয় জীবন ও উচ্চশিক্ষা: ১৯৩৯ সালে বৈশাখী পূর্ণিমায় তিনি উপসম্পদা গ্রহণ করে অগ্রবংশ ভিক্ষু নামে পরিচিত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রখ্যাত বৌদ্ধ সাধক ও পণ্ডিতদের সান্নিধ্যে ত্রিপিটক অধ্যয়ন এবং বিদর্শন ভাবনায় দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯৪৮ সালে বার্মায় গমন করে দীর্ঘদিন বৌদ্ধধর্ম ও দর্শন অধ্যয়ন করেন। পালি ভাষা-সাহিত্য ও ত্রিপিটকশাস্ত্রে তাঁর বিশেষ পাণ্ডিত্য অর্জিত হয়।

ধর্মীয় ও সামাজিক অবদান: ১৯৫৭ সালে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর তাঁকে চাকমা রাজগুরু হিসেবে বরণ করা হয়। ১৯৫৮ সালে তিনি বৌদ্ধ মিশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতি ও পার্বত্য চট্টল ভিক্ষু সমিতির মতো সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর উদ্যোগে পার্বত্য অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের প্রচার, বিহার প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।

শিক্ষা বিস্তার ও মানবকল্যাণ: কাপ্তাই বাঁধের কারণে পার্বত্য অঞ্চলের বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর তিনি শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালান। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত শিশু করুণা সংঘের সঙ্গে যুক্ত থেকে শিশুদের শিক্ষা ও আবাসনের সুযোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। তাঁর চিন্তায় উচ্চশিক্ষিত ও শাস্ত্রজ্ঞ ভিক্ষু গড়ে তোলা ছিল সমাজ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপায়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরেন। ১৯৮৫ সালে জেনেভায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। বার্মা সরকার ১৯৫৬ সালে তাঁকে ‘অগ্রমহাপণ্ডিত’ এবং ২০০৫ সালে ‘অগ্গমহাসম্মজ্যোতিকাধ্বজা’ উপাধিতে ভূষিত করে। ২০০৩ সালে তিনি মহাসংঘনায়ক পদে ভূষিত হন।

সাহিত্যকীর্তি: ধর্ম, দর্শন, পালি সাহিত্য ও সমাজ নিয়ে তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সমবায় বুদ্ধোপাসনা, বৌদ্ধ পঞ্জিকা, বুদ্ধ উপাসনা, শ্রামণ কর্তব্য, মানবধর্ম পঞ্চশীল এবং বুদ্ধ সামান্তিকা। বাংলা ও চাকমা ভাষায় কবিতা, নাটক ও ধর্মীয় সাহিত্য রচনার মাধ্যমেও তিনি জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

মহাপ্রয়াণ: ২০০৮ সালের ৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ৯৫ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ভিক্ষুজীবনের সময়কাল ছিল প্রায় ৬৯ বছর। একই বছরের ডিসেম্বরে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

উপসংহার: রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো ছিলেন ধর্মীয় প্রজ্ঞা, মানবিকতা, শিক্ষা বিস্তার ও সমাজকল্যাণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবনাদর্শ, ধর্মীয় সাধনা, সাহিত্যকর্ম এবং পার্বত্য জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। তিনি শুধু একজন ধর্মগুরু নন, বরং তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায় ও সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে স্মরণীয় এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরো নিউজ
জনপ্রিয় পোস্ট
সর্বশেষ আপডেট