রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:০২ অপরাহ্ন

অটোরিকশা থেকে কোটি টাকার সাম্রাজ্য বাগমারায় আ.লীগ পুনর্বাসনের নেপথ্যে ফিরোজ।ডুপ্লেক্স বাড়ি বিলাসবহুল গাড়ি এনজিও-ব্যবসা গোপন বৈঠক থেকে গ্রেপ্তার সম্পদের উৎস ও রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ‎
অনলাইন ডেস্ক / ২০ বার
আপডেট টাইমঃ শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

মাসুদ রানা রাজশাহী নিজস্ব প্রতিবেদক

‎একসময় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজ। কয়েক বছরের ব্যবধানে বদলে গেছে তাঁর জীবনযাত্রা। গড়ে উঠেছে ডুপ্লেক্স বাড়ি, ব্যবহারে এসেছে দামি গাড়ি, পাশাপাশি বিস্তৃত হয়েছে ব্যবসা ও এনজিও কার্যক্রম। এখন স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা আশ্রয় দেওয়া এবং সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে তিনি ভূমিকা রাখছেন। প্রশ্ন উঠেছে।অটোরিকশাচালক থেকে অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা এই ফিরোজই কি বাগমারায় আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অন্যতম নেপথ্য সংগঠক।

‎স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ রাজশাহী জেলা ও বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ফিরোজ সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। শুধু বাগমারায় নয়, ঢাকার সাভারেও বাড়ি ভাড়া নিয়ে আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন নেতাকর্মীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

‎গোপন বৈঠক থেকে গ্রেপ্তার

‎গত ১২ আগস্ট দুপুরে ফিরোজের মালিকানাধীন ‘বাগমারা সবুজ বাংলা লিঃ কার্যালয়ে বৈঠককে ঘিরে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সেখানে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে কয়েকজন সরে গেলেও ফিরোজকে গ্রেপ্তার করা হয়।

‎বাগমারা থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, গোপন বৈঠক চলাকালে ফিরোজকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৪ জুলাই ভবানীগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে ককটেল হামলার মামলায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তাঁকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাঁর সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।

‎অল্প সময়ে সম্পদের বিস্তার

‎স্থানীয়দের প্রশ্ন। অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা একজন ব্যক্তি কীভাবে কয়েক বছরের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন। বাগমারায় তাঁর ডুপ্লেক্স বাড়ি, দুটি দামি গাড়ি এবং ব্যবসা ও এনজিও কার্যক্রম নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা রয়েছে।

‎চলতি বছরের জুন ও জুলাইয়ে প্রকাশিত স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদনে ফিরোজুল ইসলামকে ঝিকরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এবং ‘সবুজ বাংলা ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁর সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

‎অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের দাবি, তাঁর বর্তমান সম্পদের উৎস ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের আর্থিক হিসাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সরকারি সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন।

‎সাভারে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ

‎স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু সময় ফিরোজ আত্মগোপনে ছিলেন। এ সময় সাভারে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকার পাশাপাশি বাগমারা থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে সেখানে আশ্রয় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

‎পরে এলাকায় ফিরে তিনি আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করেন এবং তাঁদের সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেন। এমন অভিযোগও করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা।

‎কারা রয়েছেন যোগাযোগের পরিধিতে।

‎স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ফিরোজের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ঝিকরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মানিক হোসেন উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক জলিল মাস্টার, ভবানীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র মালেক মণ্ডল এবং তাহেরপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানার নাম উঠে এসেছে।

‎তবে এসব ব্যক্তির প্রত্যেকের বর্তমান রাজনৈতিক ভূমিকা ও ফিরোজের সঙ্গে সাংগঠনিক যোগাযোগের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

‎নির্বাচন সামনে রেখে তৎপরতা।

‎ঝিকরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফিরোজ—এমন তথ্য স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচিত। এ নিয়ে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তৎপরতা রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

‎তবে নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়া এবং আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগ—দুটি বিষয়কে একই সূত্রে দেখার আগে নির্ভরযোগ্য নথি ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎ফেসবুক পেজ ঘিরেও প্রশ্ন

‎স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি পেজ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ‘বাগমারা উপজেলা যুবলীগ’ নামের একটি পেজের কথাও তাঁরা উল্লেখ করেছেন।

‎ওই পেজের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা এবং সরকারবিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পেজটি কারা পরিচালনা করছেন এবং এর সঙ্গে ফিরোজের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

‎বিএনপি নেতার অভিযোগ

‎উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও ঝিকরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান রতন বলেন  ফিরোজের সম্পদের উৎস তদন্ত করা দরকার। তাঁর অভিযোগ  ফিরোজ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছেন।

‎ফিরোজের বিরুদ্ধে মাদক ও ক্যাসিনো ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেন রতন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

‎অভিযোগের বিপরীতে কী বলছে পুলিশ?

‎পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ফিরোজকে ১২ আগস্ট একটি গোপন বৈঠক থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে একটি ককটেল হামলার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাঁর সহযোগীদের বিষয়ে তদন্ত ও অভিযান চলমান রয়েছে।

‎অর্থাৎ, ফিরোজের বিরুদ্ধে ওঠা রাজনৈতিক পুনর্বাসন, বিপুল সম্পদের উৎস, নাশকতার পরিকল্পনা, মাদক বা ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ। এসবের কোনটি প্রমাণিত এবং কোনটি কেবল রাজনৈতিক অভিযোগ, তা তদন্তেই নির্ধারিত হবে।

‎যে প্রশ্নগুলো এখন সামনে

‎অটোরিকশা চালানো থেকে কয়েক বছরের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া। এই সম্পদের উৎস কী। তাঁর ব্যবসা ও এনজিওর আর্থিক কার্যক্রম কতটা স্বচ্ছ। আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর প্রকৃত যোগাযোগ কতটা? ১২ আগস্টের বৈঠকের উদ্দেশ্য কী ছিল? আর ককটেল হামলার মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের হাতে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে।

‎এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক নথি যাচাই এবং মামলার তদন্ত শেষ হলে। তার আগে ফিরোজকে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের ‘মূল কারিগর’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে আখ্যা দেওয়া যেমন ঠিক হবে না, তেমনি অভিযোগগুলোও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

‎অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপ: ফিরোজের সম্পদের দলিল, এনজিওর নিবন্ধন ও আর্থিক নথি, গাড়ির মালিকানা, আয়কর নথি, সাভারের ভাড়া করা বাড়ির তথ্য এবং ১২ আগস্টের বৈঠকসংক্রান্ত পুলিশি নথি যাচাই করা গেলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি আরও স্পষ্ট হবে।

‎অটোরিকশা থেকে কোটি টাকার সাম্রাজ্য বাগমারায় আ.লীগ পুনর্বাসনের নেপথ্যে ফিরোজ।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরো নিউজ
জনপ্রিয় পোস্ট
সর্বশেষ আপডেট